← Back

নির্দিষ্ট পণ্যের উপর নির্ভরতা টেকসই আরএমজি খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে

নির্দিষ্ট পণ্যের উপর নির্ভরতা টেকসই আরএমজি খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভর করার ফলে খাতটির টেকসই উন্নয়নের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বৈশ্বিক বাজারের প্রবণতা অনুযায়ী উচ্চমূল্যের পণ্যগুলোতে বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে খাতটির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। 

দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের পাঁচটি ট্র্যাডিশনাল পণ্য হলো—প্যান্ট, টি-শার্ট, শার্ট, সোয়েটার এবং আন্ডারওয়্যার। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এর তথ্য অনুযায়ী, এই পণ্যগুলো গত অর্থবছরে (২০২৫) মোট প্রস্তুত পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ দশমিক ৮২ শতাংশ অবদান রেখেছে। 

শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশ থেকে ৩০টিরও বেশি ধরনের পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়। 

কিট এবং বোনা পোশাক রপ্তানিতে একত্রে ২০২৫ অর্থবছরে ৩৯ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পণ্য থেকে এসেছে ৩১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।

২০১৬ অর্থবছরে, উল্লিখিত পণ্যগুলো থেকে এসেছে ২৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার, যখন মোট আরএমজি রপ্তানি আয় ছিল ২৮ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। 

গত দশকে, আন্ডারওয়্যারের রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আর প্যান্টের রপ্তানি আয় সবচেয়ে বেশি হয়েছে। অপরদিকে, শার্টের রপ্তানি আয় প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

২০২৫ অর্থবছরে ৩১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় থেকে ১২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার এসেছে প্যান্ট থেকে, ৮ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে টি-শার্ট থেকে, ৫ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার সোয়েটার থেকে, ৩ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার শার্ট ও ব্লাউজ থেকে, এবং ২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার আন্ডারওয়্যার থেকে।

দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে পোশাক খাতের অংশ ছিল ৮১ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

রপ্তানিকারক এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ মূলত সুতির উপর ভিত্তি করে মৌলিক পণ্য তৈরি করে। তারা বলেছেন, "যদিও বৈশ্বিক বাজার এখন প্রাকৃতিক সুতির পরিবর্তে মানবসৃষ্ট ফাইবার (এমএমএফ)-ভিত্তিক পোশাকের দিকে ঝুঁকছে, বাংলাদেশে সিচুয়েশন ঠিক তার বিপরীত।"  তারা আরএমজি খাতের বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। 

তবে তারা বলছেন, বৈচিত্র্যকরণ ধীরে ধীরে ঘটছে, বিশেষত ডেনিম, ডাইং এবং ওয়াশিং সেগমেন্টে।

এছাড়া, সমালোচকরা অভিযোগ করছেন যে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বৈচিত্র্যকরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নেওয়ার অনিচ্ছা রয়েছে।

একটি খাত ও কিছু পণ্যের উপর এত বেশি নির্ভরতা রপ্তানি আয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন একজন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি স্থানীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়ানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা এবং সরকারী নীতির সহায়তার পরামর্শ দিয়েছেন, পাশাপাশি বিশ্বের অগম্য বাজারগুলো অন্বেষণ করতেও বলেছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম ইহসান দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-কে বলেন, বৈচিত্র্যকরণ ধীরে ধীরে ঘটছে এবং গত দশকে শীর্ষ-পাঁচের তালিকায়ও পরিবর্তন এসেছে, যেমন আন্ডারওয়্যার/লিঞ্জেরি বাজারে প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, তিনটি ধরনের মূল্য সংযোজন রয়েছে—দেশভিত্তিক, অভ্যন্তরীণ পণ্য এবং লাভ।

তিনি বলেন, "প্রথম দুটি বেড়েছে কারণ তারা মূলত নিট পণ্য এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে, যদিও লাভের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন হ্রাস পেয়েছে।" 

কিছু পণ্যে নির্দিষ্ট করার ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শামীম ইহসান আরও বলেন, যেহেতু অধিকাংশই মৌলিক পণ্য তৈরি করে, তারা বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় উচ্চতর সক্ষমতা তৈরি করেছে, যার ফলে মূল্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান বলেন, বৈশ্বিক চাহিদার ৭০ শতাংশই এমএমএফ-ভিত্তিক পোশাকের জন্য, আর বাংলাদেশ তার রপ্তানির ৭০-৭৫ শতাংশ সুতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করে। এটি বর্তমান বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত।

আরএমজি পণ্যের রপ্তানি আয় বাড়াতে তিনি বলেন, "রপ্তানিকারকদের এমএমএফ-ভিত্তিক পোশাকের দিকে যেতে হবে, যেন তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে এবং ভিয়েতনামের মতো ভালো দাম পেতে পারে।" 

তারা উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করার ফলে তার কারখানার রপ্তানি আয় বাড়ছে, যদিও কারখানার সংখ্যা বা ক্ষমতা বাড়েনি বলে জানিয়েছেন এই শীর্ষ রপ্তানিকারক। 

বাংলাদেশ মূলত সেসব পণ্য তৈরি করে, যার জন্য ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) গড় ৬-৮ ডলার প্রতি পিস, আর কাট অ্যান্ড মেক (সিএম)-এ একটি পোশাক সেলাইয়ের জন্য ১২-১৫ ডলার পায় এবং এমন কিছু পণ্য রয়েছে যেগুলোর সিএম ৩০ ডলার প্রতি পিস।

উল্লেখযোগ্য নেতা দুজনই বলেছেন, বাংলাদেশ এমএমএফ-ভিত্তিক পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন করতে লিংকেজ টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কারণ বাংলাদেশকে চীন এবং ভারতের থেকে এসব উপকরণ আমদানি করতে হয়।

টেক্সটাইল মিল মালিকরা আরও বলেছেন, টেক্সটাইল খাতে বৈচিত্র্যকরণ প্রয়োজন, যাতে তারা মিশ্র, এমএমএফ এবং অ-সুতি-ভিত্তিক ফাইবার এবং কাপড় উৎপাদন করতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যায় এবং শুল্ক ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন মার্কেট এক্সেস থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া যায়।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সিনথেটিক সুতা শিল্প ছোট এবং এটি এমএমএফ সুতার দেশীয় চাহিদা পূরণ করতে পারে না।

এজন্য বাংলাদেশ অধিকাংশ এমএমএফ সুতা এবং ফাইবার আমদানি করে বলে জানিয়েছেন তারা। ২০২৩ সাল পর্যন্ত, বাংলাদেশে ১৯টি সিনথেটিক স্পিনিং মিল ছিল, যার মধ্যে আটটি ছিল অ্যাক্রিলিক মিল।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এবং মাল্টিল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সি (এমআইজিএ) এর একটি নতুন ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের আরএমজি খাত একটি রূপান্তরমূলক লাফ দেওয়ার দ্বারে দাঁড়িয়ে। এটি ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে ৯৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় অর্জন করতে পারে যদি এই খাত ট্র্যাডিশনাল বাজারের বাইরেও সম্প্রসারিত হয় এবং এমএমএফ-ভিত্তিক পোশাক উৎপাদন গ্রহণ করে।

এই আয় পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করতে হবে। এর জন্য বাণিজ্য, শিল্প ও আর্থিক ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কারের প্রয়োজন হবে বলে উঠে এসেছে রিপোর্টে।  

 

-কাউসার আহমেদ সাগর। 

 

নামাজের সময়

--:--:--
  • ফজর --:--
  • যোহর --:--
  • আসর --:--
  • মাগরিব --:--
  • এশা --:--
লোড হচ্ছে...

শহর নির্বাচন করুন