← Back

পঞ্চাশ বছর পর আবার চাঁদের ডাক

নাসার আর্টেমিস-২ রকেট প্রস্তুত, চার নভোচারী নিয়ে ঐতিহাসিক উড়ান আগামীকাল

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
NASA/Bill Ingalls
ছবিঃ NASA/Bill Ingalls
১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের পথে পা বাড়াতে চলেছে। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে উৎক্ষেপণের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে, আর গোটা বিশ্ব এখন একটাই প্রশ্নের অপেক্ষায় — ১ এপ্রিল বিকেলে যখন আর্টেমিস-২-এর ইঞ্জিন জ্বলে উঠবে, তখন কি সত্যিই নতুন একটি যুগের সূচনা হবে?

পৃথিবীর মানুষ আবারও চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে — এবার শুধু স্বপ্নে নয়, বাস্তবে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) তাদের বহু প্রতীক্ষিত আর্টেমিস-২ (Artemis II) মিশনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯বি-তে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS) রকেট এবং ওরিয়ন মহাকাশযান। রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, সারা বিশ্বের মিডিয়া তাদের রিমোট ক্যামেরা তাক করেছে এই অসাধারণ দৃশ্যটির দিকে — মোবাইল লঞ্চারের উপর সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা রকেটটি যেন মানবজাতির চাঁদের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রতীক।

আগামী বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬, বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ২৪ মিনিটে (EDT বিকেল ৬টা ২৪ মিনিট) এই ঐতিহাসিক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এটি হবে নাসার এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযানের প্রথম মানববাহী উড়ান — এবং অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানুষের চাঁদের দিকে যাত্রার সূচনা।

কাউন্টডাউন শুরু: মিশন কন্ট্রোলে উত্তেজনার পারদ ঊর্ধ্বমুখী

স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৪ মিনিটে (EDT) আনুষ্ঠানিকভাবে কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। রক্কো পেত্রোনে লঞ্চ কন্ট্রোল সেন্টারে (Rocco Petrone Launch Control Center) একের পর এক প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা তাদের কনসোলে এসে বসেছেন। সেখানকার পরিবেশ এখন উত্তেজনা, একাগ্রতা ও প্রত্যাশার মিশ্রণে ভারী।

লঞ্চ টিমের সদস্যরা একযোগে ফ্লাইট হার্ডওয়্যার পাওয়ার আপ করছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিটি লিঙ্ক যাচাই করছেন এবং রকেটের ক্রায়োজেনিক সিস্টেমগুলো তৈরি করছেন। শত শত হাজার গ্যালন অতি-শীতল তরল হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেন রকেটে পূরণ করার জন্য একটি নিখুঁত ফুয়েলিং সিকোয়েন্স অনুসরণ করতে হবে — এবং সেই প্রস্তুতি এখন পুরোদমে চলছে।

লঞ্চ প্যাড ৩৯বি-তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে: সাউন্ড সাপ্রেশন সিস্টেমের বিশাল ট্যাঙ্কে পানি ভরা হচ্ছে। উৎক্ষেপণের মুহূর্তে এই পানি একটি প্রতিরক্ষামূলক বন্যার মতো ছেড়ে দেওয়া হবে, যা রকেটের ইঞ্জিনের বজ্রনাদ থেকে মহাকাশযানকে রক্ষা করবে। এই প্রযুক্তিটি দেখতে সাধারণ মনে হলেও, এটি রকেটের কাঠামোকে শব্দ-তরঙ্গের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য।

চার মহাকাশচারী: একটি ঐতিহাসিক দলের পরিচয়

আর্টেমিস-২ মিশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এর চার সদস্যের দলটি। এই চারজন মানুষ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর চাঁদের কাছে যাওয়া প্রথম মানুষ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাবেন।

কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman) — নাসার একজন অভিজ্ঞ নভোচারী, যিনি এই মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মিশনের সামগ্রিক পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা কেন্দ্রীয়।

পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover) — নাসার আরেকজন অভিজ্ঞ নভোচারী। তিনি ওরিয়ন মহাকাশযানটি চালানোর দায়িত্বে থাকবেন। ভিক্টর গ্লোভার এই মিশনের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক দিকের প্রতীক — তিনি হবেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী যিনি চাঁদের পথে যাত্রা করবেন।

মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কক (Christina Koch) — নাসার এই নভোচারী মহিলা হিসেবে প্রথমবার চাঁদের দিকে যাত্রা করবেন, যা নারীদের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen) — কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি (CSA)-এর এই নভোচারী প্রথম কানাডীয় হিসেবে চাঁদের পথে যাত্রা করতে চলেছেন। তার অংশগ্রহণ এই মিশনকে শুধু মার্কিন নয়, আন্তর্জাতিক মহাকাশ অভিযানের একটি প্রতীকে পরিণত করেছে।

ক্রু কোয়ার্টারে চার নভোচারী: অপেক্ষার শেষ মুহূর্ত

চার মহাকাশচারী বর্তমানে কেনেডি স্পেস সেন্টারের নিল এ. আর্মস্ট্রং অপারেশনস অ্যান্ড চেকআউট বিল্ডিং-এর (Neil A. Armstrong Operations and Checkout Building) অ্যাস্ট্রোনট ক্রু কোয়ার্টারে অবস্থান করছেন। কাউন্টডাউনের এই শেষ পর্যায়ে তারা কঠোর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মধ্যে কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

নভোচারীরা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের কাজে মনোনিবেশ করেছেন। উৎক্ষেপণের জন্য তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। একটি নিয়ন্ত্রিত ঘুমের সময়সূচি ও পুষ্টি পরিকল্পনা অনুসরণ করা হচ্ছে, যাতে উৎক্ষেপণের দিন তারা শারীরিকভাবে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকেন। ক্রু কোয়ার্টার থেকেই তারা রকেটের কনফিগারেশন ও আবহাওয়া পরিস্থিতির নিয়মিত আপডেট পাচ্ছেন।

এই মুহূর্তগুলো নিশ্চয়ই এই চার মানুষের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। তারা জানেন যে, কয়েক ঘণ্টা পরই তারা পৃথিবী থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ মাইল দূরে যাত্রা করবেন — এমন একটি গন্তব্যে যেখানে সর্বশেষ মানুষ গিয়েছিল ১৯৭২ সালে, অ্যাপোলো-১৭ মিশনে।

আবহাওয়ার পরিস্থিতি: ৮০ শতাংশ অনুকূল পূর্বাভাস

নাসা ও মার্কিন স্পেস ফোর্সের স্পেস লঞ্চ ডেলটা ৪৫ (Space Launch Delta 45)-এর আবহাওয়া কর্মকর্তারা উৎক্ষেপণ দিনের আবহাওয়ার প্রতি কড়া নজর রাখছেন। ট্যাংকিং অপারেশনের আগে থেকেই আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ চলছে।

বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, উৎক্ষেপণ দিনে ৮০ শতাংশ অনুকূল আবহাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রধান উদ্বেগের বিষয় দুটি: মেঘাচ্ছন্নতা এবং এলাকায় উচ্চ বাতাসের সম্ভাবনা। আগামী দিনগুলোতে আবহাওয়া দলগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে।

মহাকাশ উৎক্ষেপণে আবহাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বজ্রপাত, উচ্চ বাতাস বা ঘন মেঘ উৎক্ষেপণকে বিলম্বিত করতে পারে। তবে বর্তমান পূর্বাভাস দলটির জন্য আশাব্যঞ্জক।

সম্প্রচার পরিকল্পনা: বিশ্বজুড়ে লাইভ দেখার সুযোগ

আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। ১ এপ্রিল সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট (EDT) থেকে নাসার ইউটিউব চ্যানেলে লাইভ ভিউ ও অডিও কমেন্টারি শুরু হবে। এই সময় থেকে এসএলএস রকেটে প্রপেলান্ট লোড করার দৃশ্য সরাসরি দেখা যাবে।

NASA+ প্ল্যাটফর্মে পূর্ণাঙ্গ কভারেজ শুরু হবে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট (EDT) থেকে। সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এই মিশনের লাইভ কভারেজ পাওয়া যাবে।

অ্যাপোলো যুগের স্থির ছবি ও সীমিত সম্প্রচারের বিপরীতে, এই মিশনটি হাই-ডেফিনিশন রিয়েল-টাইম ভিডিওতে বিশ্বব্যাপী স্ট্রিম করা হবে। নতুন প্রজন্মের মানুষেরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই ইঞ্জিনের গর্জন এবং মহাকাশে উড্ডয়নের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।

সোমবার, নাসা নেতৃত্ব সর্বশেষ মিশন প্রস্তুতি নিয়ে একটি স্ট্যাটাস আপডেট ব্রিফিং করেছেন। সেখানে সামগ্রিক প্রস্তুতির ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

মিশনের বিস্তারিত: চাঁদ পরিক্রমার ১০ দিনের রোমাঞ্চকর যাত্রা

আর্টেমিস-২ একটি ১০ দিনের মিশন। এই সময়ে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ২,৫০,০০০ মাইল (প্রায় ৪ লক্ষ কিলোমিটার) দূরে যাবেন। তারা চাঁদের দূর প্রান্তকে (far side) ঘুরে আসার জন্য একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ লুপ সম্পন্ন করবেন এবং তারপর পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

এই মিশনে চাঁদে অবতরণ নেই — এটি একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাই-বাই মিশন। তবে এটি ভবিষ্যৎ চন্দ্রাবতরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করবে। ওরিয়ন মহাকাশযানের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, ডিপ-স্পেস নেভিগেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পুনরায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের (re-entry) প্রযুক্তি — সব কিছুই এই মিশনে পরীক্ষা করা হবে।

আর্টেমিস-২ মূলত আর্টেমিস-৩-এর পূর্বপ্রস্তুতি, যে মিশনে মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদে পা রাখবে এই দশকেই। এভাবেই এই মিশন মানবজাতির ভূ-পৃষ্ঠীয় ইতিহাস এবং চাঁদে স্থায়ী উপস্থিতির মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করবে।

এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন: মানবজাতির সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকাশযান

নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS) বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট। এটি অ্যাপোলো যুগের স্যাটার্ন-ভি রকেটের চেয়েও বেশি থ্রাস্ট উৎপন্ন করতে সক্ষম। এই রকেটের উচ্চতা প্রায় ৩২২ ফুট (প্রায় ৯৮ মিটার) এবং এটি লঞ্চের সময় প্রায় ৮.৮ মিলিয়ন পাউন্ড থ্রাস্ট তৈরি করবে।

ওরিয়ন মহাকাশযান বিশেষভাবে গভীর মহাকাশের চরম পরিবেশের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি মহাকাশে মারাত্মক বিকিরণ থেকে নভোচারীদের সুরক্ষা দিতে পারে, জীবন রক্ষাকারী সিস্টেম পরিচালনা করতে পারে এবং পৃথিবীতে ফেরার সময় অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করে বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশ করতে পারে।

৫০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান

১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের পথে যাত্রা করতে চলেছে। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর, পৃথিবীর মানুষ আবার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে চলেছে।

অ্যাপোলো যুগ ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফসল — স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ প্রতিযোগিতার অংশ। কিন্তু আর্টেমিস প্রোগ্রাম একটি ভিন্ন প্রেরণায় চালিত — এটি দীর্ঘমেয়াদে মানবজাতির মহাকাশে স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

নাসার এই মিশন কানাডা, ইউরোপ ও জাপানের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে মিলে পরিচালিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধিত্বকারী একটি মিশন।

ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ

আগামীকাল, ১ এপ্রিল ২০২৬ — মানবজাতির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। বিকেল ৬টা ২৪ মিনিটে (EDT) যখন আর্টেমিস-২ রকেটের ইঞ্জিন জ্বলে উঠবে এবং লঞ্চ প্যাড ৩৯বি থেকে রকেটটি আকাশের দিকে ছুটে যাবে, তখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ সরাসরি সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবেন।

চাঁদের দিকে এই যাত্রা কেবল চার নভোচারীর যাত্রা নয় — এটি সমগ্র মানবজাতির স্বপ্নের যাত্রা। এটি প্রমাণ করে যে, আমরা পৃথিবীর বাইরে যাওয়ার সাহস ও সক্ষমতা রাখি। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ তার সীমানা অতিক্রম করতে জানে।

নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম শুধু চাঁদে ফিরে যাওয়ার কর্মসূচি নয় — এটি মঙ্গলগ্রহ এবং তার পরেও মানবজাতির যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। আর্টেমিস-২ সেই মহাযাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

নামাজের সময়

--:--:--
  • ফজর --:--
  • যোহর --:--
  • আসর --:--
  • মাগরিব --:--
  • এশা --:--
লোড হচ্ছে...

শহর নির্বাচন করুন